প্রেমের টানে চীন থেকে সখীপুরে যুবক, সন্দেহে ফিরিয়ে দিল পরিবার
অনলাইনে পরিচয়, নিয়মিত কথাবার্তা, এরপর প্রেমের সম্পর্ক। সেই সম্পর্ককে বাস্তবে রূপ দিতে সুদূর চীন থেকে বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের সখীপুরে ছুটে এসেছিলেন দং লিয়াং নামের এক চীনা যুবক। উদ্দেশ্য ছিল প্রেমের মানুষটিকে বিয়ে করা। বিয়ের আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার আগ্রহের কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণ হয়নি। ভিসার মেয়াদ কম থাকা এবং প্রতারণা বা মানব পাচারের আশঙ্কায় স্থানীয় লোকজন ও তরুণীর পরিবার তাঁকে শেষ পর্যন্ত ফিরিয়ে দিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার একটি গ্রামে। শনিবার সন্ধ্যায় চীনা নাগরিক দং লিয়াং সখীপুরে পৌঁছালে বিষয়টি জানাজানি হয়। এরপর তাঁকে একনজর দেখতে ওই তরুণীর বাড়িতে ভিড় করেন স্থানীয় লোকজন। ঘটনাটি এলাকায় কৌতূহলের সৃষ্টি করে। তবে আনন্দের বদলে দ্রুতই তৈরি হয় নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ। শেষ পর্যন্ত স্থানীয়দের পরামর্শে তাঁকে ঢাকায় চীনা দূতাবাসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন মাস আগে একটি অনলাইন অ্যাপের মাধ্যমে সখীপুরের ২৫ বছর বয়সী এক তরুণীর সঙ্গে দং লিয়াংয়ের পরিচয় হয়। শুরুতে তাঁদের মধ্যে ছিল সাধারণ কথাবার্তা। ধীরে ধীরে সেই যোগাযোগ নিয়মিত হতে থাকে। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন অনলাইনে যোগাযোগের পর তাঁরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন বলে জানা গেছে।
সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শনিবার চীন থেকে বাংলাদেশে আসেন দং লিয়াং। ঢাকা হয়ে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে তিনি সখীপুর বাজারে পৌঁছান। বিদেশি নাগরিকের আগমনের খবর পেয়ে ওই তরুণী বাড়ি থেকে সখীপুরে যান। সেখানে তিনি দং লিয়াংকে স্বাগত জানান এবং পরে তাঁকে সঙ্গে করে নিজ বাড়িতে নিয়ে যান। চীনা যুবককে নিয়ে খবর দ্রুত আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। অল্প সময়ের মধ্যেই তরুণীর বাড়িতে স্থানীয় মানুষের ভিড় জমে যায়। একজন বিদেশি যুবক কেন সখীপুরের একটি গ্রামে এসেছেন, তাঁর সঙ্গে তরুণীর কী সম্পর্ক—এসব নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সিরাজুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় লোকজন তরুণীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। একই সঙ্গে বিষয়টি পুলিশকেও জানানো হয়।
তবে দং লিয়াংয়ের বাংলাদেশে আসার উদ্দেশ্য নিয়ে পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। বিশেষ করে তাঁর ভিসার মেয়াদ খুব কম থাকায় নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। তরুণীর পরিবারের আশঙ্কা ছিল, এত অল্প সময়ের মধ্যে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে তাঁকে চীনে নিয়ে যাওয়া বাস্তবে সম্ভব হবে কি না। পাশাপাশি বিদেশি নাগরিক পরিচয়ে কোনো ধরনের প্রতারণা বা মানব পাচারের ঘটনা ঘটতে পারে কি না, সেটিও তাঁরা বিবেচনায় নেন।
তরুণীর পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, বর্তমানে দং লিয়াংয়ের ভিসার মেয়াদ রয়েছে মাত্র নয় দিন। এই সময়ের মধ্যে বিয়ে সম্পন্ন করে তরুণীকে চীনে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করা কঠিন। এ ছাড়া ওই যুবকের পরিচয়, তাঁর আর্থিক ও পারিবারিক অবস্থা এবং বাংলাদেশে আসার প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করে পরিবার।
রোববার দুপুরে তরুণীর নানা প্রথম আলোকে বলেন, চীনা নাগরিকের ভিসার মেয়াদ মাত্র নয় দিন। এর মধ্যে তাঁর নাতনিকে বিয়ে করে চীনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি মানব পাচারকারীও হতে পারেন—এমন আশঙ্কাও তাঁরা উড়িয়ে দিতে পারছেন না। বিভিন্ন সময়ে চীনা নাগরিক পরিচয়ে তরুণীদের সঙ্গে সম্পর্ক ও বিয়ের পর প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে—এমন বিষয়ও তাঁদের উদ্বিগ্ন করেছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে দং লিয়াংকে আপাতত দেশে ফিরে যেতে বলা হয়। তাঁকে বলা হয়েছে, চীনে ফিরে গিয়ে ওই তরুণীর জন্য প্রয়োজনীয় ভিসার ব্যবস্থা করতে। পাশাপাশি নিজের পরিচয় ও সম্পর্কের বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র সংগ্রহ করে আবার সখীপুরে আসতে বলা হয়েছে। এরপর তাঁর সঙ্গে তরুণীর বিয়ের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পরিবারের এমন সিদ্ধান্তের পর স্থানীয় লোকজন একটি গাড়ি ভাড়া করে দং লিয়াংকে ঢাকায় চীনা দূতাবাসে পাঠিয়ে দেন। রাত ১২টার দিকে তাঁকে সখীপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে পাঠানো হয় বলে জানা গেছে।
সখীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুরাদ হোসেন রোববার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, মেয়েটি যাতে প্রতারণার শিকার না হন, সে জন্য স্থানীয় লোকজন ওই যুবকের সঙ্গে কথা বলে তাঁকে চীনা দূতাবাসে পাঠিয়ে দেন। তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়ার বিষয়টি স্থানীয় লোকজন পুলিশকে জানিয়েছেন।
এদিকে দং লিয়াংয়ের বক্তব্য ছিল ভিন্ন। তিনি জানিয়েছেন, ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে খুব শিগগিরই বাংলাদেশে ফিরে আসবেন। এরপর ধর্মীয় রীতি মেনে ওই তরুণীকে বিয়ে করবেন। অর্থাৎ স্থানীয়দের সন্দেহ বা পরিবারের আপত্তিকে তিনি চূড়ান্ত বাধা হিসেবে দেখছেন না। বরং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে আবার সখীপুরে ফিরে আসার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
ঘটনাটিকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে যেমন কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ এটিকে আন্তঃদেশীয় প্রেমের সম্পর্কের স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে অনলাইনে পরিচয় ও প্রেমের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন।
অনলাইনে পরিচয়ের মাধ্যমে ভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হওয়া বর্তমানে অস্বাভাবিক নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অ্যাপের কারণে পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষের সঙ্গে অন্য প্রান্তের মানুষের যোগাযোগ এখন অনেক সহজ। তবে এ ধরনের সম্পর্কে ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয়, পারিবারিক তথ্য, বৈবাহিক অবস্থা, আর্থিক সক্ষমতা এবং সম্পর্কের উদ্দেশ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শুধু অনলাইন যোগাযোগের ওপর নির্ভর না করে দুই পক্ষের পরিচয় ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি। বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের ক্ষেত্রে ভিসা, বৈধ কাগজপত্র, বিয়ের আইনগত প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী সময়ে বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজনীয় অনুমতিসহ বিভিন্ন বিষয় আগে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সখীপুরের এই ঘটনাতেও মূলত সেই সতর্কতার বিষয়টিই সামনে এসেছে। প্রেমের সম্পর্ক সত্যি কি না, দং লিয়াংয়ের পরিচয় ও উদ্দেশ্য কতটা নির্ভরযোগ্য, কিংবা তিনি সত্যিই বিয়ে করতে চান কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ফলে তরুণীর পরিবার তাড়াহুড়া না করে বিষয়টি যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পরিবারের ধারণা, দং লিয়াং হয়তো আর বাংলাদেশে ফিরে আসবেন না। তবে চীনা যুবক নিজেই জানিয়েছেন, তিনি ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে আবার বাংলাদেশে আসবেন এবং তরুণীকে বিয়ে করবেন। ফলে এই প্রেমের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত বিয়েতে গড়ায় কি না, নাকি এখানেই এর পরিসমাপ্তি ঘটে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সুদূর চীন থেকে প্রেমের টানে সখীপুরে আসা দং লিয়াংয়ের এই ঘটনা তাই শুধু একটি প্রেমের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনলাইন সম্পর্কের বিশ্বাসযোগ্যতা, আন্তঃদেশীয় বিয়ের আইনি প্রক্রিয়া, বিদেশি নাগরিকের পরিচয় যাচাই এবং প্রতারণা থেকে সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও। আপাতত পরিবারের সিদ্ধান্তে তাঁকে ফিরে যেতে হয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ভিসা নিয়ে তিনি সত্যিই আবার সখীপুরে ফেরেন কি না, আর ফিরলে দুই পরিবারের সম্মতিতে সেই বহুল আলোচিত বিয়ে সম্পন্ন হয় কি না—তার উত্তর সময়ই দেবে।

No comments