Header Ads

পেট্রল ছিটিয়ে ১১ বসতঘরে আগুন, এক রাতেই নিঃস্ব বহু পরিবার


লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেছে ১১টি বসতঘর। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একটি ঘরে পেট্রল ছিটিয়ে আগুন দেওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যে তা আশপাশের ঘরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে এক রাতেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছে বেশ কয়েকটি পরিবার। আগুনে ঘরবাড়ির পাশাপাশি পুড়ে গেছে আসবাবপত্র, কাপড়চোপড়, নগদ টাকা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী।


ঘটনাটি ঘটেছে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে চারটার দিকে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের বাসাবাড়ি বাজারসংলগ্ন আশহক ব্যাপারীবাড়িতে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দারা মো. সোহেল (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করে আটক করেন। পরে তাকে মারধর করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। স্থানীয়দের মারধরে আহত সোহেলকে রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোরে যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমিয়ে ছিলেন, তখন সোহেলের ঘর থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সোহেল পেট্রল ছিটিয়ে নিজের ঘরে আগুন ধরিয়ে দেন। পরে সেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের বসতঘরগুলোতে। টিনের তৈরি ঘরগুলো পাশাপাশি থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণের আগেই একের পর এক ঘর আগুনের কবলে পড়ে।

অগ্নিকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। ঘুম থেকে উঠে আগুন দেখতে পেয়ে অনেকে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। কেউ কেউ প্রাণে বাঁচলেও নিজেদের ঘর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করার সুযোগ পাননি। আগুনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, মুহূর্তের মধ্যে ঘরের আসবাবপত্র, কাপড়চোপড় ও অন্যান্য মালামাল পুড়ে যায়।

ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের একজন ছিদ্দিক উল্যাহ। তিনি পেশায় কৃষক। অগ্নিকাণ্ডে তার পুরো ঘর পুড়ে গেছে। আগুনে তার ঘরে থাকা প্রয়োজনীয় মালামাল ও নগদ টাকাও পুড়ে গেছে বলে জানান তিনি।

ছিদ্দিক উল্যাহ বলেন, ‘সোহেল পেট্রল ছিটিয়ে নিজের ঘরে আগুন দেন। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় আমার ঘরও পুড়ে যায়। ঘরে থাকা সব মালামাল ও টাকাপয়সা পুড়ে গেছে। এক মুঠো চাল, এমনকি একটি কাপড়ও বের করতে পারিনি।’

তার কথায়, এক রাতের আগুনে শুধু একটি ঘর নয়, তার পরিবারের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীও শেষ হয়ে গেছে। ঘর হারিয়ে এখন পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তিনি।

অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত আরেক বাসিন্দা আহসান উল্লাহও একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আগুন লাগার পর পরিস্থিতি এত দ্রুত ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, ঘর থেকে কোনো প্রয়োজনীয় জিনিস বের করার সুযোগ পাননি।

আহসান উল্লাহ বলেন, ‘আগুনে আমাদের ঘরের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পরনের কাপড় ছাড়া কিছুই বের করতে পারিনি। ঘরে থাকা টাকাপয়সা, আসবাবপত্র, কাপড়চোপড়—সব শেষ। মুহূর্তের মধ্যে চোখের সামনে আমাদের শেষ সম্বলটুকুও পুড়ে গেল। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় থাকব, কীভাবে আবার ঘর তুলব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকেই এখন খোলা আকাশের নিচে কিংবা স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়েছেন। ঘরবাড়ি পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড়, রান্নার সামগ্রী, খাদ্যশস্য ও নগদ টাকা হারিয়ে তারা চরম সংকটে রয়েছেন। হঠাৎ করে ঘরবাড়ি হারিয়ে এসব পরিবারের সামনে নতুন করে জীবন শুরু করার বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

আগুন লাগার খবর পেয়ে রায়পুর ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। পরে লক্ষ্মীপুর থেকে আরও একটি ইউনিট সেখানে যোগ দেয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দীর্ঘ সময় চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টার পর সকালে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ততক্ষণে ১১টি বসতঘর আগুনে পুড়ে যায়।

ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক হিসাবে, অগ্নিকাণ্ডে প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। রায়পুর ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ সৈয়দ আহমেদ বলেন, পুড়ে যাওয়া ঘরগুলো টিনের তৈরি। প্রাথমিকভাবে প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সোনাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বি এম শাহজালাল কিসমত বলেন, সোহেল নিয়মিত মাদক সেবন করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সোহেল প্রথমে পেট্রল দিয়ে নিজের ঘরে আগুন দেন। পরে সেই আগুন দ্রুত পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে।

অগ্নিকাণ্ডের পর স্থানীয় বাসিন্দারা সোহেলকে আটক করেন। এ সময় তাকে মারধর করা হয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। বর্তমানে সেখানে তার চিকিৎসা চলছে।

ঘটনার বিষয়ে রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, আগুনে ১১টি ঘর পুড়ে গেছে। স্থানীয় লোকজনের মারধরের পর সোহেলকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সোহেলের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

এক রাতের আগুনে ১১টি পরিবারের বসতঘর পুড়ে যাওয়ায় এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোক ও হতাশা। যেসব পরিবার আগুনে সবকিছু হারিয়েছে, তাদের অনেকেরই মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। কারও ঘরে থাকা সঞ্চয়ের টাকা পুড়েছে, কারও নষ্ট হয়েছে জীবনের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও পোশাক। কেউ ঘর থেকে একটি কাপড়ও বের করতে পারেননি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, আগুনের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি শুধু বসতঘর পুড়ে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারগুলোর বহুদিনের সঞ্চয়, স্বপ্ন ও নিরাপদ আশ্রয় হারানোর কষ্ট। এখন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জরুরি আশ্রয়, খাবার, পোশাক ও ঘর পুনর্নির্মাণে সহায়তা।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, পেট্রল ব্যবহার করে আগুন দেওয়ার অভিযোগ এবং এতে কার কী ধরনের ভূমিকা ছিল—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তের পরই ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। তবে প্রাথমিকভাবে ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে ১১টি বসতঘর পুড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস।

ভোরের কয়েক মিনিটের আগুনে পুরো একটি বাড়ির ১১টি ঘর পুড়ে যাওয়ার ঘটনায় এখন একটাই প্রশ্ন—নিঃস্ব হয়ে পড়া পরিবারগুলো কীভাবে আবার ঘুরে দাঁড়াবে। আগুনে তাদের ঘর পুড়েছে, পুড়েছে জীবনের সঞ্চিত অনেক স্মৃতি। এখন প্রশাসন ও সমাজের সহযোগিতাই পারে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সামনে নতুন করে বেঁচে থাকার পথ তৈরি করতে।


Popup Iframe Example
W

No comments

Powered by Blogger.